স্বাস্থ্য এবং রূপচর্চায় মধুর উপকারিতা ও ব্যবহার

মধুর উপকারিতা

আমরা জানি প্রাচীনকাল থেকে মধু রূপচর্চার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মধু বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। রান্না থেকে শুরু করে ওজন কমাতে লেবুর রসের সাথে মধুর উপকারিতা রয়েছে। বিভিন্ন রূপচর্চার পণ্যতে এটি ব্যবহার হয়। এছাড়াও স্বাস্থ্য এবং চুলের জন্য মধু অত্যন্ত কার্যকর। মধুতে রয়েছে খাদ্যগুন যা আমাদের শরীরের জন্য খবুই জরুরী।

আরও পড়ুনঃ পেস্তা বাদাম খাওয়ার ১০ টি উপকারিতা

মধু কি

মধু কি (What Is Honey)

মধু হল একটি তরল আঠালো মিষ্টি পদার্থ, যা মৌমাছি ফুল থেকে সংগ্রহ করে। এবং মৌচাকে জমা করে। পরে এই পুষ্পরসটি মৌমাছি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মধুতে রূপান্তরিত করে। এতে উপস্থিত খনিজগুলি স্বাস্থ্য এবং ত্বকের জন্য উপকারী।

আরও পড়ুনঃ হেয়ার স্পা এর উপকারিতাঃহেয়ার স্পা কি সত্যিই উপকার?

মধুর পুষ্টিগুণ (Nutritional Of Honey)

  1. ক্যালরি (১ টেবিল চামচ মধুতে 64 ক্যালরি রয়েছে)
  2. দস্তা (0.22 মিলিগ্রাম)
  3. লোহা (0.42 মিলিগ্রাম )
  4. পটাসিয়াম (52 মিলিগ্রাম)
  5. ম্যাগনেসিয়াম (2 মিলিগ্রাম )
  6. ক্যালসিয়াম (6 মিলিগ্রাম)
  7. সোডিয়াম (4 মিলিগ্রাম)
  8. ভিটামিন সি (0.5 মিলিগ্রাম )
  9. ভিটামিন বি 6 (0.024 মিলিগ্রাম )
  10. গ্লুকোজ (30-35%)
  11. ফ্রুক্টোজ (34-43%)
  12. ফোলেট (2 মাইক্রোগ্রাম )
  13. প্যানটোথেনিক অ্যাসিড (0.068 মিলিগ্রাম)
  14. রিবোফ্লাভিন (0.038 মিলিগ্রাম)
  15. নিয়াসিন (0.121 মিলিগ্রাম)

মধুর পুষ্টিগুণের উপকারিতা

মধুর পুষ্টিগুণের উপকারিতা (Nutritional Benefits Of Honey)

  • ক্যালরি – আমাদের দেহে শক্তির জোগান দেয়।
  • দস্তার উপকারিতা –  ঠান্ডা ভাইরাস প্রতিরোধ করে এবং ইমিউনিটি সিস্টেম ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে।
  • লোহা – অ্যানিমিয়া রোগের জন্য উপকারী এবং রোগ প্রতিরোধক শক্তি বৃদ্ধি করে।
  • পটাসিয়াম – রক্তচাপ সঠিকভাবে বজায় থাকে এবং এটি পেশী শক্তিশালী করে।
  • ম্যাগনেসিয়াম – সুগারের রোগীদের জন্য উপকারি এবং হাড় মজবুত রাখে।
  • ক্যালসিয়াম – শরীরের হাড় এবং দাঁত মজবুত করতে সহায়তা করে।
  • সোডিয়াম – মস্তিষ্কের কাজ, রক্ত, হৃদয় ইত্যাদির জন্য উপকারী।
  • ভিটামিন সি – হাড় ও দাঁত মজবুত রাখে এবং ঠাণ্ডার হাত থেকে রক্ষা করে ও ত্বকের জন্য উপকারী।
  • ভিটামিন বি 6 – অ্যানিমিয়া রোগের জন্য উপকারী এবং চোখের জন্য উপকারী
  • গ্লুকোজ –  বদহজম এবং কোলেস্টেরল এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং আমাদের শরীরে শক্তির উৎস হল গ্লুকোজ।
  • ফ্রুক্টোজ –  গ্লুকোজের মতোই শরীরের এনার্জি দেয় এবং শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
  • ফোলেট – লাল রক্ত ​​কোষ গঠনে সহায়তা করে, কানের জন্য উপকারী।
  • প্যানটোথেনিক অ্যাসিড – স্নায়ুতন্ত্রের সঠিকভাবে কাজ করতে সহায়তা করে এবং মনকে ফিট রাখে।
  • রিবোফ্লাভিন – দৃষ্টিশক্তি এবং মস্তিষ্কের জন্য উপকারী।
  • নিয়াসিন – কোলেস্টেরল স্তর ঠিক রাখে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ফিট রাখে।

মধুর উপকারিতা ও ব্যবহার

মধুর উপকারিতা ও ব্যবহার (Benefits And Uses Of Honey)

স্বাস্থ্যের উপকারিতা (Health Benefits) 

১. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ – Blood pressure control

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ

উচ্চ রক্তচাপের কারণে শরীর আরও অনেক রোগে আক্রান্ত হয়। তাই রক্তচাপ ঠিক রাখা খুব জরুরি। যাদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে, তারা মধু সেবন করতে পারেন। মধুর ভিতরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগগুলি পাওয়া যায়, যা রক্তচাপ সংশোধন করতে কাজ করে।

২. ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা সঠিক রাখে – Keeps triglyceride levels right 

ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা সঠিক রাখে

আপনার শরীরে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা সঠিক না থাকলে ডায়াবেটিস -২ হওয়ার ঝুঁকি থাকেঅতএব, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তার স্তরটি ঠিক রাখা। তাই এই স্তরটি শরীরে সঠিক মাত্রায় বজায় রাখতে হলে চিনির পরিবর্তে মধু খাওয়া শুরু করতে হবে।

৩. কোলেস্টেরলের মাত্রা সঠিক রাখে – Keeps cholesterol levels right

কোলেস্টেরলের মাত্রা সঠিক রাখে

কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকায় এটি সরাসরি হার্টকে প্রভাবিত করে। তাই দেহে এর মাত্রা ঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরী। মধুর ভিতরে থাকা ভিটামিনগুলি কোলেস্টেরলকে ঠিক রাখতে সহায়তা করে। তাই যারা এই রোগে ভুগছেন তাদের মধু খাওয়া উচিত।

৪. হার্টের জন্য উপকারী – Beneficial for the heart

হার্টের জন্য উপকারী

মধু খেলে হার্ট স্বাস্থ্যকর রাখা যায়। কারণ এর ভিতরে অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগগুলি পাওয়া যায় যা হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে। যাদের হার্টের সমস্যা রয়েছে তাদের উচিত এটি তাদের ডায়েটে যুক্ত করা।

৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় – Increases immunity

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

মধুতে রয়েছে দস্তা এবং লোহার মতো খনিজ পদার্থ যা  আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে তোলে। সুতরাং, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তারা তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে এটি ব্যবহার করতে পারেন।

ত্বকের উপকারিতা ( Skin Benefits)

আমাদের ত্বকের সৌন্দর্য বজায় রাখতে মধু অসাধারন উপাদান। ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য এটি খুব কার্যকরী।

  1. মুখের দাগ কমায়
  2. ত্বকের ময়শ্চারাইজার
  3. ব্রণ চিকিৎসা
  4. ত্বকের ছিদ্র দূর করতে
  5. ত্বক পরিষ্কার করতে

৬. মুখের দাগ কমায় – Reduces face scars

মুখের দাগ কমায়

মুখের, চামড়ার এবং ঠোঁটের দাগ কমাতে মধুর উপকারিতা অপরিসীম। এতে উপস্থিত অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি উপাদান মুখের দাগছোপ কমাতে সহায়তা করে।

ব্যবহারের টিপস-  ১ টেবিল চামচ নারকেল তেল বা অলিভ ওয়েলের সঙ্গে ১ টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে ত্বকে লাগিয়ে রাখুন। ২-৩ মিনিট পর ঠাণ্ডা জলে ধুয়ে ফেলুন। এইভাবে নিয়মিত পদ্ধতিতে অনুসরণ করলে ত্বকের দাগ সরে যাবে।

৭. ত্বকের ময়শ্চারাইজার – Skin moisturizer 

ত্বকের ময়শ্চারাইজার

মধু খুব ভালো ময়শ্চায়রাইজিং এর কাজ করে এবং ত্বক হাইড্রেট রাখে।

ব্যবহারের টিপস-  প্রথমে ভালো করে মুখ পরিষ্কার করে নিন। এবার অর্ধেক কলা ও পরিমাণ মতো মধু ভালো করে পেস্ট করে নিন। মিশ্রণটি মুখে ও গলায় লাগিয়ে মিনিট দশেক পর হালকা গরম জলে মুখ ধুয়ে ফেলবেন। এটি ত্বককে ময়শ্চারাইজ করে রাখে।

৮. ব্রণ চিকিৎসা – Acne treatment

ব্রণ চিকিৎসা

ব্রণ সাধারণত ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে। অ্যান্টিফাঙ্গাল এবং অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম। আর এই দুটি উপাদানই মধুতে রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ ছোট চুলের যত্নঃ দেখে নিন কীভাবে নেবেন ছোট চুলের যত্ন

ব্যবহারের টিপস-  ১ চামচ মধু নিয়ে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে ভালোভাবে প্যাক তৈরি করে মুখে লাগিয়ে ১৫-২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। লেবু ব্রণের দাগ দ্রুত কমিয়ে দেয়।

ব্রণ আক্রান্ত অংশে মধু লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। ২-৩ বার ব্যবহার করলেই ফল পাবেন।

৯. ত্বকের ছিদ্র দূর করতে – To remove skin pores

ত্বকের ছিদ্র দূর করতে

কাঁচা মধুতে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং এনজাইম রয়েছে। ব্যাকটেরিয়ার ধ্বংস করে ত্বকের ছিদ্র বন্ধ করে।

আরও পড়ুনঃ গোল্ড ফেসিয়ালের উপকারিতা জানলে অবাক হবেন

ব্যবহারের টিপস-  ১ টেবিল চামচ মধুর সঙ্গে ২ টেবিল চামচ নারকেল তেল অথবা জোজবা তেল মিশিয়ে নিন। এবার এটি ড্রাই স্ক্রিনে বা মুখে লাগিয়ে হালকা ভাবে মাসাজ করুন এবং ঠাণ্ডা জলে ধুয়ে নিন।

সতর্কতাঃ-
চোখের নিচে প্রয়োগ করবেন না। তাতে ক্ষতি হতে পারে। পরিবর্তে শসা গোল করে কেটে চোখে ঢাকনার উপরে রাখতে পারেন।

১০. ত্বক পরিষ্কার করতে – To clean the skin

মধু ত্বকের ময়লা এবং জীবাণু মুক্ত করে। ত্বকের অতিরিক্ত তৈলাক্ত পদার্থ দূর করে ত্বক পরিষ্কার করে তোলে।

ব্যবহারের টিপস-  হাফ চামচ মধু হাতের তালুতে নিয়ে ভালো করে ঘষে নিন অথবা আপনি এর মধ্যে জল মিশাতে পারেন। এবার এটি মুখে লাগিয়ে নিন। শুকিয়ে এলে হালকা উষ্ণ গরম জলে ধুয়ে নিন। ভালো ফল পেতে টোনার লাগিয়ে নিন।

আরও পড়ুনঃ শসার উপকারিতাঃ নিয়মিত শসা খান এবং সুস্থ থাকুন

চুলের উপকারিতা (Hair Benefits)

১১. চুল নরম ও উজ্জ্বল রাখে – Keeps hair soft and shiny

চুল নরম ও উজ্জ্বল রাখে

মধু চুলকে নরম করতে এবং এটি উজ্জ্বল করতে সহায়তা করে। চুল নরম ও উজ্জ্বল রাখতে একটি ডিম এবং দুই চামচ তেল ভালভাবে মিশিয়ে তার মধ্যে ৩ টেবিল চামচ মধু যোগ করে মাস্ক বানিয়ে নিন। মাস্কটি চুলে প্রয়োগ করে ৩০ মিনিট রেখে শ্যাম্পু করে নিন।

১২. চুলের ক্ষতি রোধ করে – Prevents hair loss

চুলের ক্ষতি রোধ করে

মধু আপনার চুলকে চকচকে রাখে পাশাপাশি শুষ্ক এবং নিস্তেজ চুলের জন্য ভাল কাজ করে এবং চুল ক্ষতি রোধ করে। ২ চামচ মধু ৪ চামচ টক দইয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিন। চুলে মেখে ৩০ মিনিট বাদে পরিষ্কার করে নিন।

আশা করি, মধুর উপকারিতার এই টিপসগুলি আপনাদের সহায়তা করবে। সঠিক পদ্ধতিতে অনুসরণ করুন ভালো ফল পাবেন।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন উত্তরঃ 

Q. মধু কোথা থেকে তৈরি হয়?

A. মৌমাছি ফুল থেকে একটি পুস্পরস সংগ্রহ করে যা পড়ে মৌচাকে জমা করে। এবং সেই পুষ্পরসটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মধুতে পরিণত হয়।

Q. ব্রণ কমাতে মধু দিনে কতবার ব্যবহার করব?

A. খুব দ্রুত যদি ব্রণের দাগ কমাতে চান দিনে ২ থেকে ৩ বার ব্যবহার করুন। ভালো ফল পাবেন।

Q. মধু কি ত্বক ময়শ্চারাইজ করে থাকে?

A. হ্যাঁ, মধু খুব ভালোভাবে মুখ পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে এবং ত্বক হাইড্রেট করে রাখে।

Q. মধু সরাসরি মুখে প্রয়োগ করা কি ভালো?

A. না সরাসরি প্রয়োগ করলে না করাই ভালো। আপনি মধুর সঙ্গে অন্য উপাদান মিশিয়ে প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাবেন।

Leave A Reply

Please enter your comment!
Please enter your name here