দার্জিলিং ভ্রমণ/ লোকেশন/ যাতায়াত ব্যবস্থা/ঘোরার জায়গা

দার্জিলিং

ভ্রমণ স্থানঃ দার্জিলিং

রাজ্যঃ পশ্চিমবঙ্গ

দেশঃ ভারত

জেলাঃ দার্জিলিং

ভাষাঃ বাংলা এবং নেপালি

দার্জিলিং ভারতের রাজ্যে পশ্চিমবাংলার একটি সুন্দর শহর। এই শহরটি শুধু চায়ের জন্যই না বরং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যও পরিচিত। চারদিকে দূষণমুক্ত এবং পাহাড়ে ঘেরা পরিবেশ পর্যাটকের মন ছুঁয়ে যায়। যেইসমস্ত মানুষ ঘুরতে পছন্দ করেন তাদের পছন্দের তালিকায় এই শহরটি একটি। এর জন্যই দেশ বিদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ এই শহরে প্রত্যেক বছর ভ্রমণে আসেন। পাশাপাশি এখানে ভ্রমণের প্রচুর জায়গা রয়েছে যা মানুষের মন ভরিয়ে তোলে।

দার্জিলিং-768x576

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা দার্জিলিং এর ভ্রমণ সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য আপনাদের জানাব যাতে আপনাদের কিছুটা সহযোগিতা হয়। আজকের এই নিবন্ধে আমরা দার্জিলিং এর লোকেশন, আবহাওয়া, খাবার- দাবার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দার্জিলিং ঘুরতে যাওয়ার কয়েকটি জায়গা সম্পর্কে আপনাদের জানাব। তাহলে চলুন শুরু করি আজকের নিবন্ধ দার্জিলিং।

লোকেশন (Location)

লোকেশন

দার্জিলিং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি শহর। এই শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬,৭০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এই শহরে প্রায় পুরো বছর জুড়েই ঠাণ্ডা থাকে।

আরও পড়ুন| পুরী ভ্রমণ/লোকেশন/যোগাযোগ ব্যবস্থা/ভ্রমণের স্থান

আবহাওয়া (Weather)

দার্জিলিং পাহাড়ী অঞ্চলের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ১৫.৯৮ °সে এবং ও গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮.৯ ° সেলসিয়াস থাকে।

যাতায়াত ব্যবস্থা (Transportation system)

যাতায়াত ব্যবস্থা

দার্জিলিং যাতায়াত এখন সবচেয়ে সুবিধাজনক। কারণ সব জায়গা থেকেই এখন দার্জিলিং যাওয়ার জন্য ট্রেনের পরিষেবা রয়েছে। তবে কলকাতা থেকে যেতে চাইলে বিভিন্ন ট্রেন পেয়ে যাবেন। তবে আপনাকে ট্রেনে এনজিপিতে যেতে হবে অর্থাৎ নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত যেতে হবে এবং সেখান থেকে গাড়িতে দার্জিলিং। আপনি নিউ জলপাইগুড়ি নেমেই অনেক প্যাকেজ পরিষেবা দেওয়ার সংস্থা পেয়ে যাবেন।

আরও পড়ুন| মন্দারমণি সমুদ্র সৈকত/ লোকেশন/ যোগাযোগ ব্যবস্থা/ ভ্রমণের স্থান

খাবার- দাবার (Food )

খাবার- দাবার

দার্জিলিং এর ভিন্ন জাতীয় খাবার পাওয়া যায়। যেহেতু ভিন্ন ধর্মের পর্যাটকের আনাগোনা, তাই এখানে সবরকম খাবার ব্যবস্থা রয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় রেস্টুরেন্টগুলিতে আপনি মহাদেশীয়, থাই, চীনা, নেপালি খাবারের পাশাপাশি বাঙালি খাবারও পেয়ে যাবেন। মোমো, নুডুলস, বিভিন্ন ধরণের স্যুপ এখানে অসাধারণ এবং অবশ্যই এখানকার চা বিশ্ব বিখ্যাত।

মোমো: ফ্রায়েড ও স্টিম ভেজ ও নন-ভেজ মোমো দার্জিলিংয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাস্তা।

থুকপা: তিব্বতের একটি জনপ্রিয় খাবার। থুকপা ডিম, মাংস এবং শাকসব্জী দিয়ে পরিবেশন করা একটি পুষ্টিকর সুস্বাদু গরম নুডলস স্যুপ।

কেনাকাটা (Shopping) 

কেনাকাটা

Source

দার্জিলিং এর কালো চায়ের জন্য সর্বাধিক বিখ্যাত। দাম প্রতি কেজি 500 টাকা থেকে শুরু। দার্জিলিংয়ের মলে কাপড়, শীতের পোশাক, হাতে বোনা কাপড়, হস্তশিল্প কেনাকাটা করতে পারবেন।

আরও পড়ুন| দীঘাঃ দীঘা ভ্রমণ, সমুদ্র সৈকত, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

ভ্রমণের সেরা সময় (The best time to travel) 

ভ্রমণের সেরা সময়

দার্জিলিং ভ্রমণে সবচেয়ে সেরা সময় মার্চ থেকে মে এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে। এই মাসগুলিতে আবহাওয়া খুব মনোরম এবং আকাশ পরিষ্কার থাকে যার অর্থ সুন্দর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার খুব সম্ভাবনা রয়েছে।

ভ্রমণের জায়গা (Traveling place) 

  1. টাইগার হিল (Tiger Hill):

টাইগার হিল

দার্জিলিং থেকে টাইগার হিল ১১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং টাইগার হিলটি প্রায় ২৫৯০ মিটার উচ্চ। টাইগার হিল থেকে ভোরবেলা সূর্যোদয় দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা ভোলা যায় না। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরগুলি আলোকিত হয়ে ওঠে। সূর্যোদয়ের সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব চিত্র দেখার জন্য অগণিত মানুষ ভিড় করে টাইগার হিলে।

এই দৃশ্য জীবনে স্মৃতি করে রাখার জন্য টাইগার হিল একটি উপযুক্ত ভ্রমণ স্পট। তবে আপনাকে টাইগার হিলে সানরাইজ দেখার জন্য ভোর ৩ টের সময় বেরিয়ে পড়তে হবে। কারণ প্রতিদিন সানরাইজ দর্শনের জন্য শত শত মানুষের মানুষের ভিড় পড়ে।

  1. বাতাসিয়া লুপ (Batasia Loop):

বাতাসিয়া লুপ

দার্জিলিং শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাতাসিয়া লুপ। এই জায়গাটি খুবই সুন্দর। দার্জিলিং গেলে অবশ্যই এই জায়গাটি থেকে একবার ঘুরে আসুন। এখানে ট্রয় ট্রেন চড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনি এই সুন্দর পরিবেশের মজাও ভোগ করতে পারবেন। এই ট্রয় ট্রেন ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরে এবং দার্জিলিং স্টেশন থেকে বাটাসিয়া লুপ ঘোরে।

দার্জিলিং এই সুন্দর পরিবেশ উপভোগ করার চেয়ে আর ভালো কিছু হতে পারে না। বাতাসিয়া লুপে বাগানের মাঝখানে একটি মেমোরিয়াল রয়েছে যা গোর্খা সৈনিকদের উদ্দেশ্যে বানানো হয়েছিল। এছাড়াও এই বাতাসিয়া লুপ থেকে আপনি কাঞ্চনজঙ্ঘা চূড়া এবং পূর্ব হিমালয়ান শিখর দেখতে পাবেন। দার্জিলিং থেকে আপনি ট্যাক্সি করে ১৫ মিনিটের মধ্যে পৌছে যাবেন বাতাসিয়া লুপে।

আরও পড়ুন| কক্সবাজার ট্র্যাভেল গাইড/ বাংলাদেশ

  1. দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (Darjeeling Himalayan Railway):

দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে

Source

দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে দার্জিলিং ট্রয় ট্রেন নামে পরিচিত যা দুই ফুট ন্যারো গেজ রেল পরিষেবা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং এর মধ্যে চলাচলকারী পরিষেবা। দার্জিলিং ট্রয় ট্রেন একটি অসাধারণ দৃশ্য আশ্চর্যজনক পাহাড় দর্শনীয় স্থান। এখানে আপনি ট্রয় ট্রেনের সুন্দর যাত্রা উপভোগ করতে পারবেন। বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে একটি দারুন ঘোরার জায়গা। তারা এখানে আনন্দের সহিত ট্রয় ট্রেন চড়া উপভোগ করতে পারে।

  1. হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট (Happy Valley Tea Estate):

দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে

Source

রোজ ভ্যালি টি এস্টেট দার্জিলিঙয়ের বিখ্যাত চা বাগান, যা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ আমলে। এই চায়ের বাগান ২১০০ মিটার উঁচুতে এবং ৪৪০ একর জমিতে অবস্থিত। ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই চায়ের বাগানটি সবচেয়ে সেরা কারণ এটি বিশ্বের দ্বিতীয় পুরনো চায়ের বাগান। এখানে গেলে আপনার চোখে পড়বে চা বাগানে কর্মরত শ্রমিক এবং কর্মচারীর সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশি।

হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট একটি আকর্ষণীয় জিনিস হল আপনি এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাসে যদি ঘুরতে যান তাহলে দেখতে পাবেন সেখানকার স্থানীয় নেপালি মহিলারাই চাপাতা তুলছে। চা বাগানে অনেক চায়ের ঝোপ রয়েছে যেগুলি প্রায় ১০০ বছরের পুরনো। এছাড়া আপনি চা কারখানার ভেতরেও ঘুরতে যেতে পারবেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে চা প্রক্রিয়াকরণ দেখতে পাবেন।

  1. ঘুম স্টেশন (Ghoom Station):

Ghoom Station

Source

ঘুম রেল স্টেশন দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের একটি ছোট অংশ। এই ছোট স্টেশনটি ২২৫৮ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এবং এটি ভারতের সবচেয়ে উচু রেলওয়ে স্টেশন। এটি দার্জিলিং এর খুব কাছে এই স্টেশনটি। এটি একটি সুন্দর রেলওয়ে স্টেশন।

আরও পড়ুন| ওড়িশার কাছেই চমৎকার উইকেন্ড ডেস্টিনেশন দারিংবাড়ি

  1. দার্জিলিং রোপওয়ে (Darjeeling Ropeways):

Ropeway,_Darjeeling,_Photo-2

Source

এই রোপওয়ে ১৯৮৬ সালে শুরু করা হয়েছিল কিন্তু পড়ে ৪ ই অক্টোবর ২০০৩ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে ২০১২ সালে আবার এই রোপওয়ে খুলে দেওয়া হয়েছিল। রোপওয়ে সফর করার সময় ঝরনা, পাহাড়, চায়ের বাগান এই সমস্ত দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন।

  1. জাপানি মন্দির এবং শান্তি প্যাগোডা (Japanese Temple & Peace Pagoda):

জাপানি মন্দির এবং শান্তি প্যাগোডা

দার্জিলিং শহর থেকে গাড়ি করে ১০ মিনিটের পথ গেলে একটি এলাকায় পৌঁছাবেন যেখানে শান্তির প্রতীক। দার্জিলিং এর জাপানি মন্দির একটি শান্তির স্তূপ। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছিল জাপানি স্টাইলে যেখানে বহু মানুষ এসে লর্ড বুদ্ধের প্রার্থনায়। ১৯৯২ সালে ১ নভেম্বর এই স্তূপটি জনসাধারণের জন্য খোলা হয়েছিল। এর পাশেই রয়েছে শান্তির প্যাগোডা যেখানে আপনি দেখতে পারবেন লর্ড বুদ্ধের চারটি অবতার। এখান থেকে আপনি কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারের শিখর দৃশ্য দেখতে পাবেন।

  1. দার্জিলিং মল (Darjeeling Mall):

দার্জিলিং মল

দার্জিলিং মল দার্জিলিং শহরে অবস্থিত। এটি একটি সুন্দর এলাকা যেখানে সন্ধ্যাবেলায় অগণিত পর্যাটকের ভিড় পড়ে কেনাকাটা এবং খাওয়া- দাওয়ার জন্য। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে আপনি কাঞ্চনজঙ্ঘাও দেখতে পাবেন। এছাড়াও আশেপাশে পরিবেশ অপূর্ব।

  1. অবজার্ভেটরি হিল এবং মহাকাল মন্দির (Observatory Hill and Mahakal Temple):

অবজার্ভেটরি হিল এবং মহাকাল মন্দির

মলের ঠিক পিছনে অবজার্ভেটরি হিল একটি আদর্শ জায়গা যেখান থেকে দার্জিলিং এর ৩৬০ ডিগ্রি দৃশ্য এবং পাহাড়ের চারপাশের দৃশ্য দেখা যায়। মহাকাল মন্দির দার্জিলিং এর কেন্দ্রে এবং পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। মহাকাল মন্দির যেখানে অবস্থিত সেখানে আগে বৌদ্ধ মঠটি ছিল।

  1. রক গার্ডেন (Rock Garden):

রক গার্ডেন

রক গার্ডেন একটি বাহারি ঝরনার বাগান। দার্জিলিং শহর থেকে কয়েক মাইল পরেই রক গার্ডেন। রক গার্ডেন প্রায় ১০ কিলোমিটার এবং গঙ্গা মায়া সেখান থেকে ৩ কিলোমিটার । গঙ্গা মায়া, রক গার্ডেনের ঝরনার জল প্রবাহিত হওয়ার পথেই তৈরি হয়। এই গার্ডেনের ভিতর অপূর্ব সুন্দর বাহারি রঙের ফুলে ভরা এবং ওয়াটার ফল দেখতে পাবেন।

আপনি যদি দার্জিলিং যেতে চান তাহলে এই সব জায়গাগুলি থেকে একবার অবশ্যই ঘুরে আসুন। সত্যিই আপনার এই জায়গাগুলো খুবই ভালো লাগবে। এই জায়গায়গুলি ছাড়াও আরও কিছু দার্জিলিঙয়ে ঘোরার জায়গা রয়েছে।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন উত্তরঃ

Q. দার্জিলিংয়ের ঘোরার স্থান কি কি আছে? 

A. দার্জিলিংয়ে টাইগার হিল, বাতাসিয়া লুপ, হিমালয়ান রেলওয়ে, হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট, ঘুম স্টেশন,জাপানি মন্দির এবং শান্তি প্যাগোডা, দার্জিলিং মল, অবজার্ভেটরি হিল এবং মহাকাল মন্দির, রক গার্ডেন, চিড়িয়াখানা ভ্রমণ স্থান রয়েছে।

Q. দার্জিলিংয়ের ঘোরার সবচেয়ে সেরা সময় কোনটা? 

A. মার্চ থেকে মে এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে।

Q. দার্জিলিংয়ের জনপ্রিয় খাবার কি? 

A. মোমো, থুকপা, চীনা, থাই, নেপালি খাবার।

Q. কলকাতা থেকে দার্জিলিং কীভাবে যাওয়া যাবে? 

A. কলকাতা থেকে যেতে চাইলে ট্রেনে এনজিপিতে যেতে হবে অর্থাৎ নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত যেতে হবে এবং সেখান থেকে গাড়িতে দার্জিলিং।

Leave A Reply

Please enter your comment!
Please enter your name here